ধুনট উপজেলাবগুড়া জেলা
প্রধান খবর

বগুড়ায় বাণিজ্যিক আঙ্গুর চাষে নতুন সম্ভাবনা, মিলছে সফলতার স্বাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছী গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী এক আঙ্গুর বাগান। সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে কালো, সবুজ ও হলুদ রঙের আঙ্গুর। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বিদেশের কোনো আধুনিক ফলবাগান। আর এই উদ্যোগের রূপকার স্থানীয় তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম নাহিদ (৩৩)।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বগুড়ায় এখনো বড় পরিসরে বাণিজ্যিক আঙ্গুর বাগান গড়ে ওঠেনি। তবে কয়েকজন উদ্যোক্তা পরীক্ষামূলকভাবে আঙ্গুর চাষ শুরু করেছেন। এর মধ্যে ধুনটের নাহিদের বাগান স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

এর আগে বগুড়া সদর উপজেলার লাহেরীপাড়া ইউনিয়নের সাতশিমুলিয়া গ্রামের মো. আবু সাঈদ অল্প পরিসরে আঙ্গুর চাষ শুরু করলেও সফলতা পাননি। তার ছেলে মো. আলিফ জানান, একটি গাছে ফল এলেও আঙ্গুর টক স্বাদের হওয়ায় পরে গাছটি নার্সারিতে দিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে নতুন করে দুটি চারা রোপণ করা হয়েছে।

উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন নাহিদ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফল চাষে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন থেকেই শুরু হয় তার কৃষিযাত্রা।

২০২৪ সালে তিনি নিজ এলাকায় বেদানা, পেয়ারা, ড্রাগন ফল ও বিভিন্ন জাতের বরই চাষ শুরু করেন। তবে তার কৃষিজীবনের বড় পরিবর্তন আসে একটি আঙ্গুর বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হওয়ার পর।

নাহিদ জানান, বন্ধুর বাগানে বাংলাদেশের মাটিতে সফলভাবে আঙ্গুরের ফলন দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও এবং রাজশাহীর এক সফল চাষির পরামর্শ নিয়ে আঙ্গুর চাষের কৌশল রপ্ত করেন।

এরপর ১৫ শতক জমিতে ৯২টি আঙ্গুরের চারা রোপণ করে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল থাকলেও আত্মবিশ্বাস হারাননি নাহিদ।

মাত্র তিন মাসের মধ্যেই বাগানে প্রথম ফল আসে। বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় ফলন পাচ্ছেন তিনি। পুরো বাগানজুড়ে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে সুস্বাদু আঙ্গুর। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার বাগান দেখতে ভিড় করছেন।

বর্তমানে তিনি গ্রীন লং, বাইকুনর ও জয় সিডলেস জাতের আঙ্গুর চাষ করছেন। এসব জাত তুলনামূলক মিষ্টি, রসালো এবং বাজারে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন।

নাহিদ বলেন, প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে শুরু করা এই বাগান থেকে এবার ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আঙ্গুর ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় বাজার ও পরিচিত ক্রেতাদের কাছে আঙ্গুর বিক্রি শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, আঙ্গুর চাষে রাসায়নিক সারের ব্যবহার খুবই কম। মূলত জৈব সার, গোবর ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করছি। এতে ফলের স্বাদ ভালো থাকে এবং উৎপাদন খরচও কম হয়।

তিনি আরও জানান, নিয়মিত ছাঁটাই, লতা বেঁধে দেওয়া এবং সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা আঙ্গুর চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গরম ও বর্ষাকালে বাড়তি যত্ন নিতে হয়।

নাহিদের বাগানের ছবি ও ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবে তার আঙ্গুর বাগান নিয়ে প্রশংসা করছেন অনেকে। এতে আশপাশের তরুণদের মাঝেও আধুনিক ফল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

বগুড়া শহরের মাটিডালী এলাকার এক ব্যবসায়ী বাগান পরিদর্শন শেষে বলেন, ভিডিওতে অনেক জায়গায় আঙ্গুর চাষ দেখেছি, কিন্তু আমাদের এলাকাতেই এত ভালো ফলন হবে ভাবিনি। আঙ্গুর খেয়েও খুব ভালো লেগেছে।

তিনি জানান, নিজের বাড়ির ছাদে বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে। এবার আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করে ছাদে চাষের পরিকল্পনা করছেন।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, বগুড়ায় এখনো বড় আকারে বাণিজ্যিক আঙ্গুর বাগান গড়ে ওঠেনি। তবে ধুনটের নাহিদ আঙ্গুরসহ বিভিন্ন ফল চাষে সফল হয়েছেন। তার বাগানের আঙ্গুরের স্বাদ ভালো হওয়ায় অন্য কৃষকরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

ধুনট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছামিদুল ইসলাম বলেন, আঙ্গুরসহ লাভজনক বিভিন্ন ফল চাষে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করছে কৃষি বিভাগ।

তিনি জানান, বর্তমানে ধুনট উপজেলায় প্রায় ১ হেক্টর জমিতে আঙ্গুর চাষ হচ্ছে। কৃষকদের আগ্রহ বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এ চাষ আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বিদেশি ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে আঙ্গুর চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি লাভজনক কৃষিখাতে পরিণত হতে পারে।

স্বপ্ন, সাহস ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে বাংলাদেশের মাটিতেও অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়- তরুণ উদ্যোক্তা নাহিদের আঙ্গুর বাগান যেন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button