বগুড়া জেলা
প্রধান খবর

বগুড়ায় উন্নয়নের গতি, ক্ষতিপূরণে ধীরগতি

সম্পাদকীয়
তানজিজুল ইসলাম স্মরণ

বগুড়া উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র, কৃষি ও বাণিজ্যের জেলা হিসেবে এখানে একের পর এক সড়ক, রেলপথ, শিল্প, নগরায়ণ এবং অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, এবং জনস্বার্থে প্রয়োজনে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। তবে সেই ক্ষমতার সঙ্গে সমানভাবে জড়িয়ে আছে একটি সাংবিধানিক, আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব- যার জমি অধিগ্রহণ করা হবে, তাঁকে যেন দ্রুত, স্বচ্ছ, মানবিক ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং কোনোভাবেই অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বগুড়ার বাস্তবতা কি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে?

ভূমি অধিগ্রহণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই বৈধ দলিল, খতিয়ান, নামজারি, খাজনা পরিশোধের রসিদ, উত্তরাধিকার সনদসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও আবেদনকারীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক আবেদন ‘মিসকেস’ হিসেবে ঝুলে থাকে। একের পর এক শুনানির তারিখ, একই নথি বারবার জমা দেওয়ার নির্দেশ, নতুন নতুন ব্যাখ্যার চাহিদা এবং অনির্দিষ্ট অপেক্ষা-এসব যেন অনেক আবেদনকারীর জন্য একটি অন্তহীন প্রশাসনিক চক্রে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিক যদি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব নথি জমা দেন, আদালতের রায়, সরকারি রেকর্ড, নামজারি এবং খাজনা পরিশোধের প্রমাণ উপস্থাপন করেন, তাহলে তাঁর আবেদন নিষ্পত্তি হতে মাসের পর মাস সময় লাগবে কেন? যদি কোনো আইনি জটিলতা থেকেই থাকে, তবে সেটি দ্রুত নিরসন করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা কোনোভাবেই সুশাসনের পরিচয় হতে পারে না।

আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের প্রক্রিয়া কোনো বিচারিক মামলা নয়; এটি একটি প্রশাসনিক সেবা। তাই এটি এমন একটি প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, যেখানে নাগরিককে বারবার নিজের বৈধতা প্রমাণের বোঝা বহন করতে না হয়। প্রয়োজনীয় নথি গ্রহণের পর দ্রুত যাচাই, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।

এই দীর্ঘসূত্রতার ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এর গভীর মানসিক মূল্যও রয়েছে। প্রতিটি শুনানির আগে একজন আবেদনকারী আশা করেন হয়তো এবার সিদ্ধান্ত হবে, হয়তো এবার তাঁর ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত হবে। পরিবারও সেই আশায় দিন গোনে। কিন্তু প্রতিবারই যদি নতুন তারিখ, নতুন আপত্তি কিংবা নতুন নথির চাহিদা সামনে আসে, তাহলে সেই অপেক্ষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় হতাশা, উদ্বেগ ও অসহায়ত্বে। একটি পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা থমকে যায়, আর রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।

অন্যদিকে ক্ষতিপূরণের অর্থ সময়মতো না পেলে কেউ নতুন জমি কিনতে পারেন না, কেউ নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে পারেন না, কেউ ব্যবসা বা কৃষিকাজে বিনিয়োগ করতে পারেন না। অথচ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ঠিকই এগিয়ে চলে। উন্নয়নের সুফল রাষ্ট্র পায়, কিন্তু বিলম্বের বোঝা বহন করেন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক।

আরও একটি বিষয় নাগরিকদের বিস্মিত করে। কোনো আদেশ জারির পরও সেই আদেশের কপি পেতে আবার আলাদা আবেদন, নির্ধারিত ফরম এবং নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যে আদেশ সরাসরি একজন নাগরিকের সম্পত্তি ও অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটি কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় না? ডিজিটাল যুগে এটি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকবান্ধব প্রশাসনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।

এখানেই আসে জবাবদিহির প্রশ্ন। যদি কোনো কর্মকর্তা অযৌক্তিকভাবে একটি ফাইল দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখেন, একই কাগজ বারবার চান কিংবা অপ্রয়োজনীয় কারণে সিদ্ধান্ত দিতে বিলম্ব করেন, তাহলে তার দায়ভার কে নেবেন? নাগরিকের বারবার অফিসে যাতায়াত, কর্মঘণ্টা নষ্ট, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং মানসিক যন্ত্রণার জন্য কি কোনো জবাবদিহি রয়েছে? যদি না থাকে, তবে সেবামুখী প্রশাসনের দাবি কতটা বাস্তব?

আজ যখন নতুন বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, তখন ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাও নতুন সময়ের উপযোগী হতে হবে। অনলাইনে আবেদন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, এসএমএস বা মোবাইল নোটিফিকেশনের মাধ্যমে শুনানির তারিখ ও ফাইলের অবস্থা জানানো, আদেশের ডিজিটাল কপি সরবরাহ, একবার জমা দেওয়া নথি পুনরায় না চাওয়ার নীতি, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি এবং অকারণে বিলম্ব হলে তার লিখিত ব্যাখ্যা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্র যখন জনস্বার্থে কোনো নাগরিকের জমি অধিগ্রহণ করে, তখন প্রকৃতপক্ষে সেই নাগরিকই উন্নয়নের অংশীদার হন। তিনি উন্নয়নের পথে একটি ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করেন, যার সুফল ভোগ করে পুরো সমাজ। তাই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং সম্মান, সহযোগিতা এবং মর্যাদার সঙ্গে সেবা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন বৈধ জমির মালিকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি গ্রহণের পর প্রশাসনের দায়িত্ব হবে দ্রুত যাচাই, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যদি নির্ধারিত সময়সীমা থাকে, তবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে সময়সীমা ও জবাবদিহি থাকা উচিত। উন্নয়নের গতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উন্নয়নের ন্যায়বিচারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বগুড়া লাইভ বিশ্বাস করে, উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। রাষ্ট্র উন্নয়ন করবে, কিন্তু সেই উন্নয়নের ভার কোনো বৈধ জমির মালিকের কাঁধে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের আস্থা অর্জন করে। আর সেই আস্থা তৈরি হয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানবিকতা এবং সময়মতো সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

মনে রাখতে হবে, ভূমি অধিগ্রহণ কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইন দ্বারা পরিচালিত একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব। আর নাগরিকও কোনো দয়া প্রার্থী নন; তিনি সংবিধান ও আইন প্রদত্ত অধিকারের দাবিদার।

বিলম্বিত ন্যায়বিচার, অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার সমান। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ একজন নাগরিক যখন বছরের পর বছর নিজের বৈধ কাগজপত্রের স্বীকৃতি এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় থাকেন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু তাঁর আর্থিক অবস্থা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর মানসিক স্থিতি, পরিবারের নিরাপত্তাবোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসও।

বগুড়া উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক-এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই উন্নয়নের যাত্রায় কোনো বৈধ জমির মালিক যেন হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অন্তহীন অপেক্ষার প্রতীক হয়ে না ওঠেন। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নে নয়; বরং যাদের ত্যাগের ওপর সেই উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের প্রতি রাষ্ট্র কতটা ন্যায়বিচার করেছে, সেখানেই তার প্রকৃত মূল্যায়ন।

প্রশ্ন একটাই- জনস্বার্থে ভূমি অধিগ্রহণ হবে, এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রশাসন কি বৈধ জমির মালিকের ন্যায়সঙ্গত অধিকার, মর্যাদা এবং সময়মতো প্রাপ্য নিশ্চিত করতে সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ?

আমরা বিশ্বাস করি, বগুড়া থেকেই একটি আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, মানবিক এবং নাগরিকবান্ধব ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থার সূচনা হতে পারে। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নয়; বরং সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে সাধারণ নাগরিককে কতটা সম্মান, ন্যায়বিচার ও সময়োপযোগী সেবা দিতে পারে- সেখানেই নিহিত তার প্রকৃত শক্তি।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button