
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় মারধরের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পর এবার ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হামলার অভিযোগ তুলে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করা মামলায় পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এরপর সংঘর্ষে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন ১৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. নাফিউল ইসলাম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনির হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. প্রান্ত ইসলাম, সদস্য রাকিবুল হাসান রাকিব এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শিহাব।
বগুড়া শহর ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক রাতুল আহসান রিয়াদ স্বাক্ষরিত এক বার্তায় বলা হয়েছে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি অনুমোদন করেন বগুড়া শহর ছাত্রদলের সভাপতি এস এম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান রিমন।
বহিষ্কারাদেশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বগুড়া শহর ছাত্রদলের সভাপতি এস এম রাঙ্গা লেখেন, “আমরা নিরুপায়….. আমাদের বলার মত ভাষা নাই…. ছাত্রদল কে কেউ বুঝতে চায় না।”
বহিষ্কারের বিষয়ে বগুড়া শহর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান রিমন বলেন, “হাসপাতালের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় জাতীয় পর্যায়ে একটি ইস্যু তৈরি হয়েছে। দলের জাতীয় পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে চাপ ছিল। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ ঘটনা বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়ে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে এবং এটি বগুড়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত, সেহেতু দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সম্মতিতে বাধ্য হয়েই ছাত্রদলের সদস্যদের বহিষ্কার করা হয়েছে।”
বগুড়া শহর ছাত্রদলের সভাপতি এস এম রাঙ্গা বলেন, “পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কষ্ট ও ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে বাধ্য হয়েই ছাত্রদলের সদস্যদের বহিষ্কার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যত বেশি সময়ক্ষেপণ করা হতো, হাসপাতালে থাকা রোগীদের ভোগান্তি ততই বাড়ত। এ কারণে বগুড়ার শীর্ষ নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে হাসপাতালের জরুরি আলোচনা সভা চলাকালীন তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।”
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানা গেছে, সম্মিলিত কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার রাতে। বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের আব্দুল মালেক (৫০) অ্যাজমাজনিত সমস্যা নিয়ে শজিমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনেরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের দেওয়া ভুল ইনজেকশনের কারণেই আব্দুল মালেকের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তাঁরা দাবি করেন, সংঘর্ষে তাঁদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের আঘাত গুরুতর বলেও তাঁরা জানান।
এ ঘটনায় বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানায় মামলা করে। পরে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এরপর বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেন। এতে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তবে জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা চালু ছিল।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন, অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং একজন রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ একজন অ্যাটেনডেন্ট রাখার ব্যবস্থা করা।
পরে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, নার্স এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন। এরপর হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা পুনরায় চালু হয়।
শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর-এ-মোর্শেদ বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি ব্যাহত হয়নি। মিডলেভেল চিকিৎসক, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানসহ অন্যান্য চিকিৎসকেরা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার পর ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছেন। ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা পুনরায় চালু হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষেরই অভিযোগ রয়েছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হামলার অভিযোগ করেছেন, অন্যদিকে রোগীর স্বজনেরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলেছেন। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ ও কার দায় কতটুকু, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। এর মধ্যে গ্রেপ্তার, কারাবরণ এবং পরে ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকর্মীর বহিষ্কারের ঘটনায় শজিমেকের এই সংঘর্ষ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।



