
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন আজ। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম শহরে জন্ম নিয়েছিলেন সংগীতের এই অমর শিল্পী। শারীরিকভাবে তিনি আজ নেই, তবে তাঁর গান, কণ্ঠ ও গিটারের সুরে এখনো বেঁচে আছেন কোটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ে।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর বাবা ইশহাক চৌধুরী এবং মা নুরজাহান বেগম। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠলেও পরিবারের অন্য কারও সঙ্গে সংগীতের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। ছোটবেলা থেকেই অবশ্য গিটারের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর।
জানা যায়, কিংবদন্তি গিটারবাদক জিমি হেনড্রিক্সকে দেখার পর গিটারের প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর আগ্রহ আরও গভীর হয়। ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর সংগীতজীবনের শুরু। পরের বছর যোগ দেন ব্যান্ড ফিলিংসে। সেখানে তাঁর গাওয়া প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। এরপর তিনি যুক্ত হন সোলস ব্যান্ডে।
১৯৮০ সাল থেকে প্রায় এক দশক সোলসের সঙ্গে পথচলা তাঁর সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে আইয়ুব বাচ্চু নিজেই গড়ে তোলেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। শুরুতে এর পূর্ণ নাম ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ায় একই নামে আরেকটি ব্যান্ড থাকায় পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় লাভ রানস ব্লাইন্ড।
নব্বইয়ের দশকে বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রাখে এলআরবি। আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠ, গিটারবাদন ও সুরের স্বাতন্ত্র্য তাঁকে দ্রুতই আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মঞ্চ মাতিয়েছেন তিনি। গিটারবাদনের অনন্য দক্ষতার কারণে সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘গিটার জাদুকর’ হিসেবে।
চলচ্চিত্রের গানেও অনন্য আইয়ুব বাচ্চু
শুধু ব্যান্ড সংগীত নয়, চলচ্চিত্রের গানেও ছিল তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি। ১৯৯৯ সালে ‘লাল বাদশা’ ও ‘আম্মাজান’, ২০০০ সালে ‘গুন্ডা নাম্বার ওয়ান’, ২০০৪ সালে ‘ব্যাচেলর’ ও ‘রং নাম্বার’, ২০০৯ সালে ‘চাঁদের মতো বউ’, ২০১২ সালে ‘চোরাবালি’, ২০১৩ সালে ‘টেলিভিশন’ এবং ২০১৪ সালে ‘এক কাপ চা’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
এর মধ্যে ‘আম্মাজান’ গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গান হিসেবে আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।
একক অ্যালবামেও ছিল সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার
১৯৮৬ সালে ‘রক্তগোলাপ’ দিয়ে একক অ্যালবামের যাত্রা শুরু করেন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কী!’, ‘দুটি মন’, ‘কাফেলা’, ‘প্রেম প্রেমের মতো’, ‘পথের গান’, ‘ভাটির টানে মাটির গানে’, ‘জীবন’, ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’, ‘রিমঝিম বৃষ্টি’, ‘বলিনি কখনো’ ও ‘জীবনের গল্প’।
অন্যদিকে এলআরবির প্রথম অ্যালবাম ‘এলআরবি’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। এরপর ‘ব্যান্ডের সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘ফেরারী মন’, ‘স্বপ্ন’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মনে আছে নাকি নেই’, ‘স্পর্শ’ ও ‘যুদ্ধ’সহ একাধিক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন মিশ্র অ্যালবামেও কাজ করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। নব্বইয়ের দশকে এলআরবি ও ফিলিংস যৌথভাবে ‘ক্যাপসুল’ ও ‘স্ক্রু ড্রাইভার’ নামে দুটি শ্রোতাপ্রিয় অ্যালবাম উপহার দেয়।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য গান, সুর ও গিটারবাদনের মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু তৈরি করে গেছেন নিজস্ব এক জগৎ। তাঁর কণ্ঠে যেমন ছিল গভীর আবেগ, তেমনি গিটারের তারে ছিল বিদ্রোহ, ভালোবাসা ও জীবনের নানা গল্প।
শিল্পী নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও অমলিন। জন্মদিনে শ্রদ্ধা, গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু।

