প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরও বেঁচে আছেন টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত প্রথম নারী

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম নারী ক্রিস্টা পাইক প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও বেঁচে আছেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দুটি ইনজেকশন দেওয়ার পরও তাঁর হৃদস্পন্দন চলছিল। বর্তমানে তাঁকে হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে পাইকই একমাত্র নারী। অঙ্গরাজ্যটিতে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আর কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
পাইকের বন্ধু অ্যাশলি সেলার্স জানান, চলতি সপ্তাহের শুরুতে তাঁদের শেষবার যোগাযোগ হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতির সময় কারাকক্ষ থেকে পাইক তাঁকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। পাইক বলেছিলেন, বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তিনি চান না তাঁর কোনো প্রিয়জন সেখানে উপস্থিত থাকুক।
সেলার্স বলেন, ‘সে চায় না আমরা ওই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই।’
এদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইকের আইনি দল তা স্থগিত করার জন্য জরুরি আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়, ‘মিস পাইক জ্ঞান হারিয়েছেন, কিন্তু তাঁর হৃদস্পন্দন এখনও চলছে এবং তিনি স্পষ্টতই নাক ডাকছেন।’
পাইকের একজন আইনজীবী বিবিসিকে জানিয়েছেন, ৫০ বছর বয়সী পাইককে হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে পেন্টোবারবিটালের দুটি সিরিঞ্জ দেওয়া হয়েছিল।
বুধবার স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৮টার দিকে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁকে পেন্টোবারবিটালের দুটি ডোজ দেওয়া হয়েছিল এবং সাক্ষী কক্ষের পর্দা দুইবার বন্ধ করা হয়। একপর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীদের চলে যেতে বলা হয়েছিল।
পাইকের আইনি দল টেনেসিয়ান সংবাদপত্রকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আজ রাতে টেনেসি রাজ্য আবারও একটি আইনসম্মত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘সঠিক প্রমাণিত হওয়া নিয়ে আমরা আনন্দিত নই, কিন্তু মিস পাইকের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। শিরা খুঁজে পেতে অসুবিধা, শিরা ফেটে যাওয়া, কার্যকারিতাহীন পেন্টোবারবিটাল এবং আকস্মিক ও অনিবার্য প্রয়োজনের সময় জরুরি চিকিৎসার অভাব-এই সবকিছুই এমন এক প্রটোকলের অধীনে ঘটে, যা কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা।’
অন্যদিকে, টেনেসি সংশোধন বিভাগ জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টায় তারা সব পদক্ষেপ সঠিকভাবে অনুসরণ করেছে বলে মনে করে।
বিভাগের মুখপাত্র ডোরিন্ডা কার্টার টেনেসির স্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেন, ‘টেনেসি সংশোধন বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত রাজ্যের আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যপ্রণালীর প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, প্রটোকলে থাকা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের রাসায়নিকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। প্রটোকলে নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতির অনুমতি নেই। পাইককে কারাগারের বাইরের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এমোরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ডক্টর জোয়েল জিভোট পাইকের আইনি দলের নিযুক্ত চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার সময় সম্ভবত পাইকের রক্তে পেন্টোবারবিটালের মাত্রা এতটা বাড়েনি, যাতে শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
একটি ইমেইলে জিভোট বলেন, পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় পাইকের মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাইকের আইনজীবীরা ইনজেকশন প্রয়োগে দৃশ্যত ত্রুটির কথা উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জরুরি আবেদন করেন। জেলা জজ ক্লিফটন এল কর্কার এক রায়ে উল্লেখ করেন, আবেদনে চাওয়া অনুযায়ী চিকিৎসাকর্মীরা ইতোমধ্যে সেবা দেওয়া শুরু করেছেন।
পাইকের আইনজীবীদের শেষ মুহূর্তের একাধিক আইনি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা শুরু হয়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রাণঘাতী ইনজেকশন বন্ধের দুটি পৃথক প্রচেষ্টা খারিজ করে দেয়।
বুধবার গভীর রাতে সুপ্রিম কোর্ট দিনের শুরুতে নিম্ন আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করে। নিম্ন আদালত পাইকের মামলার যুক্তিগুলো বিবেচনার জন্য আরও সময় প্রয়োজন বলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছিল।
এর আগে পাইকের আইনজীবীদের করা আরেকটি আপিলও খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ওই আপিলে তাঁরা যুক্তি দিয়েছিলেন, ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে জুরি তাঁর শৈশবে যৌন নির্যাতনের নথিভুক্ত ইতিহাসের মতো প্রমাণ বিবেচনার সুযোগ পায়নি।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন, পাইক শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে মিথ্যা বলেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, তিনি যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন-এটি তারা অস্বীকার করে না।
এ সপ্তাহে টেনেসির গভর্নরও পাইকের ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৯৬ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের সময় পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি ও তাঁর তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ ১৯ বছর বয়সী স্লেমারকে মারধর ও নির্যাতন করে হত্যা করেন। সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরিচালিত চাকরিবিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল।
পাইকের ক্ষমার আবেদনে তিনি বলেছেন, স্লেমারকে পেটাতে চেয়েছিলেন, হত্যা করতে নয়। কিন্তু নিজেকে সংযত করতে পারেননি।
নিজের এক বিবৃতিতে পাইক বলেন, ‘আমি তখন মানসিকভাবে অসুস্থ এক ১৮ বছর বয়সী কিশোরী ছিলাম। আমি যা করেছিলাম তার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতেই আমার বহু বছর লেগে যায়। আমি কতগুলো জীবনকে প্রভাবিত করেছি, তা মেনে নিতে আরও বেশি সময় লেগেছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি কারও সন্তান, বোন, বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছি। এমন একটি অপরাধ করার ক্ষমতা আমার ছিল, এটা ভেবে এখন আমার গা গুলিয়ে ওঠে।’
স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ বলেছেন, তিনি পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখতে চেয়েছেন। শনিবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, ‘যখনই আমি এ নিয়ে ভাবি, আমার মনে পড়ে কলিনের সে যন্ত্রণার কথা, যে উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছিল।’
মার্টিনেজ আরও বলেছেন, পাইকের সাজা কার্যকর হতে দেখার জন্য তিনি কয়েক দশক ধরে অপেক্ষা করেছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রত্যক্ষ করতে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে ফ্লোরিডা থেকে টেনেসি আসার খরচ জোগাতে একটি দল তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করেছে।
কয়েক দিন আগে এপিকে তিনি বলেন, ‘এমন একটা দিন বা মিনিটও যায় না, যেদিন আমি কলিনের কথা ভাবি না। আর ছুটির দিনগুলো সবচেয়ে খারাপ কাটে।’
১৯৯৫ সালে টেনেসির নক্সভিলে ওই হত্যাকাণ্ড গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিহত কলিনের বুকে একটি উল্টো পেন্টাগ্রাম খোদাই করা ছিল, যা শয়তানের উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত গোষ্ঠীর প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে পাইক বরাবরই ওই প্রতীক খোদাই করার কথা অস্বীকার করে এসেছেন।
হত্যার আগে পাইক কলিনের বিরুদ্ধে তাঁকে অপমান করা এবং তাঁর তৎকালীন প্রেমিককে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেছিলেন। প্রশিক্ষণ শিবিরের আরও দুজন বাসিন্দা পরে সাক্ষ্য দেন, পাইক হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তা নিয়ে দম্ভ করেছিলেন এবং তাঁদের কলিনের মাথার খুলির একটি টুকরো দেখিয়েছিলেন।
১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালু করার পর থেকে দেশটিতে ১৮ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পুরুষের সংখ্যা ১ হাজার ৬৬৩। নারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার হার মোট সংখ্যার প্রায় এক শতাংশ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা



