উত্তরাঞ্চল
প্রধান খবর

২০ বছরেও চালু হয়নি বিরল স্থলবন্দর

রেল-সড়ক সুবিধা থাকলেও বন্ধ আমদানি-রপ্তানি ও যাত্রী পারাপার, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

দিনাজপুর থেকে ফিরে রিপন দাসঃ
রেল ও সড়ক যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিরল স্থলবন্দর প্রায় ২০ বছরেও চালু হয়নি। ফলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি এবং পাসপোর্টধারী যাত্রী পারাপারের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বন্দরটি চালু না থাকায় সরকার প্রতি মাসে কী পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তার কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর থেকে বছরে কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের ধারণা, রেল ও সড়ক, দুই ধরনের যোগাযোগ সুবিধা থাকায় বিরল স্থলবন্দর চালু হলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মোঃ রেজা হুমায়ুন ফারুক চৌধুরী বলেন, বিরল স্থলবন্দর চালু হলে রেলপথে কম খরচে পণ্য আনা-নেওয়া সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।

হিলি আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সভাপতি মোঃ নাজমুল হক বলেন, বিরলে রেলপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকায় ব্যয় কমতে পারে। পাথর আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টনে অন্তত ১০০ টাকা পরিবহন ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিরল সিপি (কাস্টমস পয়েন্ট) ইনচার্জ মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৯৬৪ সালে এ সীমান্তপথ চালু হওয়ার পর ২০২০ সাল পর্যন্ত যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক ছিল। পণ্য পরিবহনের কার্যক্রমও ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত চলেছে। করোনাভাইরাসের মহামারির সময় পণ্য ও যাত্রী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি পণ্যবাহী ট্রেন বিরল স্থলবন্দরে এলেও নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়নি।

২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিরল স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এরপরও সাবস্টেশন ও চার লেনের লুপলাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। বন্দরের জন্য ১৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও ভারতের রাধিকাপুর পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য সড়ক নির্মাণের কাজও থেমে আছে।

করোনা মহামারি শেষে দেশের অন্যান্য স্থলবন্দরে যাত্রী পারাপার চালু হলেও বিরলে গত ছয় বছরেও ইমিগ্রেশন সুবিধা চালু হয়নি।

ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সহজ করতে ২০০৫ সালে বিরল স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। পরে ২৫ বছরের জন্য ‘বিরল ল্যান্ডপোর্ট লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১১ সালে পার্বতীপুর-বিরল মিটারগেজ রেললাইন ব্রডগেজে রূপান্তর করা হয়। এতে রেলপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য সাদিক রিয়াজ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বিরল স্থলবন্দর চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বন্দরটি চালু হলে ভারত যাতায়াতে স্থানীয় মানুষের সুবিধা বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

স্থানীয়দেরও একই দাবি। বিরল উপজেলার খোপড়া গ্রামের কৃষক মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, বন্দর চালু হলে এর আশপাশে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।

স্থানীয় শরিফুল ইসলাম বলেন, বন্দরের জন্য অধিগ্রহণ করা আবাদি জমি পড়ে থাকায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জমি পতিত থাকার পাশাপাশি অধিগ্রহণে ব্যয় করা অর্থও কার্যকরভাবে কাজে লাগছে না।

ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসায়ী মোসলেম হক বলেন, বন্দরটি চালু হলে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।

বিরল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোঃ আতিউর রহমান বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বন্দরটি চালু হলে প্রত্যক্ষভাবে অন্তত আড়াই হাজার এবং পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। রেল ও সড়ক দুই সুবিধা থাকায় বন্দরটি চালু হলে বৃহত্তর দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও বগুড়ার ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবেন।

দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে বিরল স্থলবন্দর। প্রায় ৬২ বছর আগে চালু হওয়া এ সীমান্তপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশের পর রাধিকাপুর থেকে দূরপাল্লার ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে পাসপোর্টধারী যাত্রীরা দ্রুত ইমিগ্রেশন সুবিধা চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button