সারাদেশ
প্রধান খবর

২,০০০ মেগাওয়াট ছাড়াল লোডশেডিং: জনজীবন-শিল্প-কৃষিতে চরম ভোগান্তি

গ্রীষ্মের ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এতে জনজীবন, শিল্পকারখানা ও কৃষিখাতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ-এর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাত ১টায় সম্ভাব্য ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ১৯৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ২ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। বিদ্যুৎব্যবস্থা বর্তমানে তীব্র চাপের মুখে রয়েছে এবং পিক আওয়ারে প্রয়োজনীয় উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জেলাভেদে ভয়াবহ লোডশেডিং

বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। গাজীপুরে প্রায় ২৮ শতাংশ, সাভারে ৪৫ শতাংশের বেশি এবং সিলেটে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। অনেক এলাকায় দিনে কয়েকবার কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে মানুষকে।

গাজীপুরে ৪৮৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৩৪৯ মেগাওয়াট। সাভারে ৩১৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৭৫ মেগাওয়াট।

সিলেটে মোট ৪৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২৯৭ মেগাওয়াট। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

খুলনায় ৬৫০ থেকে ৬৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৫৪০ থেকে ৫৭০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি থাকছে ১১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। গ্রামীণ এলাকায় অতিরিক্ত আরও ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে।

বরিশালে ১৬০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কম হওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

জনজীবনে চরম দুর্ভোগ

তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

গাজীপুরের মাধববাড়ির বাসিন্দা বুলবুল বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে ঘরে থাকা দায়। ফ্যান বন্ধ থাকলে মশার উপদ্রবে দরজা-জানালা খোলা রাখা যায় না।”

সাভারের ব্যাংক টাউনের আমিরুন নেসা বলেন, “দিনে অন্তত ৪ থেকে ৫ বার লোডশেডিং হয়। রাতে যদি ঘুমের সময়ও বিদ্যুৎ না থাকে, তবে মানুষ ঘুমাবে কীভাবে?”

সিলেটের শিবগঞ্জের সামিয়া বেগম বলেন, “কারেন্ট একটু পরে পরে যায়।” তিনি জানান, তার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছে না।

বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সংকট বেড়েছে

বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা অথবা সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করায় সংকট আরও বেড়েছে।

চট্টগ্রামে ২৮টি কেন্দ্র ও প্রধান ইউনিটের মধ্যে ৯টি বন্ধ রয়েছে। রাউজান ও জুলধার প্রধান ইউনিট বন্ধ রয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিটও বন্ধ রয়েছে।

খুলনায় ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬টি বন্ধ। এর মধ্যে খুলনা (৩৩০ মেগাওয়াট), ফরিদপুর (৫০ মেগাওয়াট), নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি (২২৫ মেগাওয়াট), মধুমতী (১০০ মেগাওয়াট) ও রূপসা (১০৫ মেগাওয়াট) উল্লেখযোগ্য।

সিলেটে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, এলএনজি আমদানির সমস্যা এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শিল্পে উৎপাদন কমছে, ব্যবসায় লোকসান

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গাজীপুরের সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, “বিদ্যুতের এই চরম ঘাটতিতে শিল্প উৎপাদন প্রায় স্থবির। সামনে ঈদ, অথচ সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে পারব কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।”

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চামড়া সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে।

বগুড়ার বীথি প্লাস্টিকের মালিক তৌফিকুল ইসলাম নিরব জানান, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে তাদের উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।

সিলেটের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী জুনায়েদ আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে গ্রাহকরা অর্ডার দিয়েও দোকান ছেড়ে চলে যান।

কুয়াকাটার হোটেল খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। জেনারেটর চালাতে ডিজেল সংকটের কারণে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কৃষিতে সেচ সংকট

চলমান বোরো মৌসুমে লোডশেডিংয়ের কারণে সেচকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষকরা শঙ্কায় রয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, “অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যাচ্ছে না।”

খুলনার কৃষকরাও জানিয়েছেন, যখন পাম্প চালানোর প্রয়োজন হয়, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: টিবিএস নিউজ

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button