বগুড়া জেলা
প্রধান খবর

মৌসুমের শুরুতেই ধানের দরপতন, বগুড়ায় প্রতি মণে গড়ে ৩০০ টাকা লোকসান

উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি; বৃষ্টি, মিলার সংকট ও বাজারচাপে হতাশ কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক:
উত্তরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই ধানের দাম কমে যাওয়ায় লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের। জাত ও মানভেদে বিভিন্ন এলাকায় প্রতি মণ ধানে গড়ে ৩০০ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই দরপতনে হতাশ চাষিরা আশঙ্কা করছেন, পুরোদমে কাটা-মাড়াই শুরু হলে ধানের দাম আরও কমে যেতে পারে।

কৃষকদের হিসাবে, এবার প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২ থেকে ২৫ টাকায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ধানের দাম কিছুটা কম হলেও এবার ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সামগ্রিক উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে এ বছর ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার বিঘায় বোরো আবাদ করা হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ টন। বগুড়ায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে, যেখানে প্রতি বিঘায় ১৮ থেকে ২০ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন আরও ভালো হতে পারত, তবে টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

নন্দীগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানিতে জমি প্লাবিত হয়েছে। দ্রুত ধান কাটা না হলে হেলে পড়া ধান থেকে কুশি গজিয়ে মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিংজানি গ্রামের কৃষক রাসেল মাহমুদ জানান, বৃষ্টির কারণে তার ৮ বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি সাড়ে ৪ বিঘার ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। তবে পানির কারণে ধানের মান নষ্ট হয়েছে এবং ফলনও কমেছে। গত বছর যেখানে বিঘায় ২২ থেকে ২৪ মণ মিনিকেট ধান পেয়েছিলেন, এবার পেয়েছেন গড়ে ১৯ মণ। তিনি বলেন, “প্রতিমণ ধানে গড়ে ৩০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। মিলাররা ধান কিনছে না, আর গত বছরের ধান মজুত থাকায় বাজারে দাম কম।”

শাজাহানপুর উপজেলার কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, ৪ বিঘা জমিতে কাটারী জাতের ধান চাষ করে তিনি বিপাকে পড়েছেন। অতিবৃষ্টিতে ধান হেলে পড়ায় কাটতে শ্রমিক খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে দাম কম থাকায় লোকসান গুণতে হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় পাইকারি ধানের বাজার রণবাঘা হাট-এ প্রতি হাটবারে ১৮ থেকে ২০ হাজার মণ ধান বেচাকেনা হয়। এ বাজারের পাইকার আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, মিনিকেট ধান বর্তমানে প্রতি মণ ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গত বছর একই ধান বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১,৪০০ টাকায়।

সরকারি ক্রয়মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ১,৪৪০ টাকা। কিন্তু বাজারে তা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, “সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে কৃষক লাভবান হবেন। কিন্তু মিলারদের মাধ্যমে কেনায় প্রান্তিক চাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর বগুড়া উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ জানান, জেলায় চলতি মৌসুমে ১৩ লাখ ৮৮ হাজার ৪১৬ বিঘা জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৭ হাজার ৯১০ বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছে এবং গড়ে প্রতি বিঘায় ১৯ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পূর্ণমাত্রায় কাটা-মাড়াই শুরু হলে মোট উৎপাদন আরও বাড়বে।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button