বগুড়া জেলা
প্রধান খবর

ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে বিপাকে কৃষক, বিঘায় লোকসান কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: উত্তরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষকদের দাবি, এলাকা ও ধানের জাতভেদে প্রতি মণে ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় অন্তত ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। অথচ গত বছর একই সময়ে ধান বিক্রি করে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন তারা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, ধান-চাল সংগ্রহে সরকারের সময় নির্ধারণে বিলম্ব এবং বৈরী আবহাওয়া এবারের সংকটের প্রধান কারণ। যদিও অধিকাংশ এলাকায় বোরো ধানের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধান রোপণ ও কাটামাড়াইয়ের সময় ভিন্ন হওয়ায় বাজারদরেও পার্থক্য দেখা গেছে। বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে ধান কাটা শুরু হওয়ায় মৌসুমের শুরুতে কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। এতে প্রতি মণে ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত ক্ষতির শিকার হয়েছেন তারা।

বগুড়া, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ চলনবিল অঞ্চলের ৬১টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬শ গ্রামে জানুয়ারির শুরুতেই বোরো আবাদ শুরু হয়। এসব এলাকায় এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ধান কাটামাড়াই শুরু হয়েছে।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের কৃষক মো. মুনসুর রহমান (৬১) জানান, তিনি ২০ বিঘা জমিতে মিনিকেট ধানের চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় গড়ে ২২ মণ ফলন হলেও মৌসুমের শুরুতে ধান বিক্রি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে। পরে দাম বেড়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় উঠলেও উৎপাদন ও কাটামাড়াই খরচ দাঁড়িয়েছে বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। এতে প্রতি বিঘায় অন্তত ৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানান তিনি। তার হিসাবে, ২০ বিঘা জমিতে মোট ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ টাকারও বেশি।

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের কৃষক মো. শাহীন আলম সাজু জানান, তিনি ৬ বিঘা জমিতে কাটারী ও মিনিকেট ধানের চাষ করেছেন। মৌসুমের শুরুতে কাঁচা ধান পাইকারি বিক্রি করতে হয়েছে গড়ে ৯৫০ টাকা মণ দরে। পরে শুকনা ধানের দাম বেড়ে ১ হাজার ৪০০ টাকায় উঠলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের মুখ দেখেননি।

তিনি বলেন, “চাষাবাদে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা এবং কাটামাড়াইয়ে আরও প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফলনও কমে বিঘায় ১৮ থেকে ১৯ মণে নেমে এসেছে। গত বছরের তুলনায় কাটামাড়াইয়ের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় এবার প্রতি বিঘায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।”

কৃষকদের দাবি, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে এলাকা ও ধানের জাতভেদে পৃথক মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

চলনবিল এলাকার কৃষকেরা জানান, অনেক নিচু এলাকা এখনও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে আছে। এতে পাকা ধান নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না। যেসব এলাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে গত বছরের তুলনায় ধান কাটার খরচ প্রায় দ্বিগুণ।

এদিকে, গত বছর সরকার ২০ এপ্রিল থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করলেও এবার তা শুরু হয়েছে ৩ মে। সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি সংগ্রহ শুরু হতে প্রায় দুই সপ্তাহ দেরি হওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দালাল ও ফড়িয়াদের হাতে। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে তাদের।

বগুড়ার রানবাঘা হাট উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ধানের বাজার। এখানকার পাইকার মো. হাবিবুর রহমান রতন (৪৬) বলেন, “সরকারি মূল্য নির্ধারণের আগে ধানের বাজারদর অনেক কম ছিল। এতে কৃষকদের প্রতি মণে অন্তত ৪শ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি ক্রয়মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সেখানে মোটা ধানের প্রাধান্য বেশি। কিন্তু উত্তরাঞ্চলে চিকন ধানের চাষ বেশি হওয়ায় কৃষকেরা সেই দামে ধান বিক্রি করে লাভবান হতে পারছেন না।”

খাদ্য অধিদপ্তর চলতি বোরো মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান, ৪৯ টাকা কেজি দরে ১২ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৪৮ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মে পর্যন্ত ১০ দিনে সারা দেশে সংগ্রহ করা হয়েছে ৩ হাজার ৮৩ মেট্রিক টন ধান, ৮ হাজার ১৫ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ১ হাজার ৪৩৯ মেট্রিক টন আতপ চাল।

বগুড়ার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, “সরকারি গুদামে ধানের সরবরাহ ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। সরকার কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ধানের দাম নির্ধারণ করেছে। শুরুতে বাজারদর কম থাকলেও বর্তমানে তা কিছুটা বেড়েছে। সরকারি সংগ্রহ শুরু হওয়ায় কৃষকেরা উপকৃত হচ্ছেন।”

অন্যদিকে, বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ জানান, জেলায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি হেক্টরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৩ মেট্রিক টন, বর্তমানে গড় ফলন পাওয়া যাচ্ছে ৬ দশমিক ১৫ মেট্রিক টন। কাটা-মাড়াই পুরোপুরি শেষ হলে গড় ফলন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

চলতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের ৫০ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২ কোটি ২৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাতীয় গড় ফলনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৬ দশমিক ৬৯ মেট্রিক টন।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button