বগুড়া জেলা
প্রধান খবর

বগুড়ার মহাস্থানগড় জাদুঘরের আড়ালে হাজারো প্রত্ননিদর্শন

গুদামে বন্দী ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণাগার হলেও স্থান সংকটের কারণে হাজার হাজার মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন এখনো গুদামে বন্দী হয়ে আছে। বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া এসব নিদর্শনের প্রতি দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও সেগুলো প্রদর্শনের কার্যকর উদ্যোগ দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, জাদুঘর সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩৬ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে পুণ্ড্রনগর ও মহাস্থানগড় এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বিপুল সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু পাওয়া যায়। এর কিছু অংশ জাদুঘরে প্রদর্শিত হলেও জায়গার অভাবে অধিকাংশ নিদর্শন গুদামে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

১৯৬৭ সালে নির্মিত জাদুঘরটিতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৮শ’ প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে। জাদুঘরের ৪৪টি গ্যালারি ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম আমলে পাওয়া কয়েক হাজার প্রত্নবস্তু দর্শনার্থীদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

এছাড়া ১৯৯১ সালের পর বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আলাদা গুদামে সংরক্ষিত রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে পাথরের ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, ধাতব মুদ্রা, অলঙ্কার ও মৃৎপাত্রসহ প্রাচীন সভ্যতার নানা মূল্যবান নিদর্শন।

জাদুঘরে সংরক্ষিত অধিকাংশ প্রত্নবস্তুর সময়কাল নবম থেকে একাদশ শতক হলেও কিছু নিদর্শনের বয়স যীশু খ্রিষ্টের জন্মেরও বহু আগের। ইতিহাসবিদদের মতে, এসব প্রত্নবস্তু শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুদামে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকা এসব প্রত্ননিদর্শন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীরা। তাদের মতে, মহাস্থানগড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে হলে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, বর্তমানে প্রদর্শিত নিদর্শনগুলো দেখেই প্রাচীন বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু আরও হাজারো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু গুদামে পড়ে আছে জেনে তারা হতাশ হয়েছেন। তাদের দাবি, জাদুঘরের পরিধি বাড়িয়ে দ্রুত এসব নিদর্শন প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলে নতুন প্রজন্ম দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও জানতে পারবে।

বগুড়া পরিবেশ উন্নয়ন নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল খালেক বলেন, কয়েক মাস আগে তিনি মহাস্থানগড় জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারেন প্রদর্শিত প্রত্নবস্তুর বাইরেও বিপুল সংখ্যক নিদর্শন গুদামে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু দর্শকদের সেগুলো দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “এসব প্রত্নসম্পদ গুদামে বস্তাবন্দী না রেখে জাদুঘর সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলে দর্শনার্থীরা নতুন কিছু জানার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটকরাও ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সমৃদ্ধ ধারণা লাভ করতে পারবেন।”

বগুড়া মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, গুদামে সংরক্ষিত প্রত্নবস্তুগুলো মূলত দর্শনার্থীদের জন্যই সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রদর্শনের জায়গা না থাকায় সেগুলো উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, “জাদুঘর সম্প্রসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সংরক্ষিত সব প্রত্নবস্তু ধাপে ধাপে প্রদর্শনের আওতায় আনা হবে।”

এ বিষয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, স্থান সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। জাদুঘর সম্প্রসারণ এবং আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণের একটি প্রস্তাবনা ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গুদামে থাকা প্রত্ননিদর্শন ধাপে ধাপে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা যাবে।

বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন মহাস্থানগড়-এ বিভিন্ন সময় খননে পাথর, মাটি ও ধাতব তৈরি অসংখ্য মূল্যবান প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে, যা দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। তাই ইতিহাসবিদ ও সচেতন মহলের দাবি, এসব প্রত্নসম্পদ যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দেশের ঐতিহ্য তুলে ধরা প্রয়োজন।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button