হ্যাচারি, পোনা উৎপাদন ও বাণিজ্যিক মাছ চাষে বদলে গেছে বগুড়ার আদমদীঘির অর্থনীতি

একসময় কৃষিনির্ভর জনপদ হিসেবে পরিচিত বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হ্যাচারি, রেনু ও পোনা উৎপাদন, বাণিজ্যিক মাছ চাষ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে গেছে এ অঞ্চলের অর্থনীতি। স্থানীয়দের দাবি, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে আদমদীঘি এখন দেশের মৎস্য শিল্পের একটি সফল মডেল।
স্থানীয় মৎস্য চাষি ও উদ্যোক্তারা জানান, আদমদীঘিতে উৎপাদিত মাছ ও পোনা শুধু দেশের বিভিন্ন জেলাতেই নয়, সীমান্তবর্তী এলাকাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে মৎস্য খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি।
শিল্পায়ন ও নগরায়নের গতি তুলনামূলক কম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। তবে আশির দশক থেকে বাণিজ্যিক মাছ চাষের প্রসার ঘটায় কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। এতে বহু প্রান্তিক কৃষক ও নিম্ন আয়ের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় রক্তদহ ও চলন বিল থেকে দেশীয় মাছের পোনা সংগ্রহ করা হতো। পরে ১৯৮২ সালে আদমদীঘির মাঝিপাড়া গ্রামের মনমত সরকার প্রথম বেসরকারিভাবে একটি কৃত্রিম মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র (হ্যাচারি) প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে মিরর কার্প, সিলভার কার্প, রুই ও কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন শুরু হয়। ১৯৯২ সালে বাণিজ্যিকভাবে পাঙ্গাসের পোনা উৎপাদন শুরু হলে এ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আদমদীঘিতে ৭০টিরও বেশি বেসরকারি হ্যাচারি রয়েছে। এছাড়া প্রায় সাত হাজার পুকুর ও দিঘিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে। প্রতিবছর এখানে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন রেনু, প্রায় ৫০ মেট্রিক টন পোনা এবং প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন বাজারজাতযোগ্য মাছ উৎপাদিত হয়।
তবে স্থানীয় চাষিদের দাবি, প্রকৃত উৎপাদন সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি। এখানকার পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সান্তাহারে অবস্থিত মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র দেশীয় বিলুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজননে সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় স্থানীয় মাছ চাষেও আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার বেড়েছে।
আদমদীঘির মৎস্য খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা আব্দুল মহিত তালুকদার। কালাইকুড়িতে তার বৃহৎ মৎস্য প্রকল্প রয়েছে। তিনিই উপজেলায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার মৎস্য প্রকল্পে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা পেয়েছেন মৎস্য উদ্যোক্তা রফি আহম্মেদ আচ্চু। স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা বেলাল হোসেন সরদার দেশের অন্যতম সফল মাছ চাষি হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রায় ২০০ একর জলাশয়ে মাছ চাষ করছেন এবং দুটি ফিড মিল পরিচালনা করছেন। তার প্রকল্পগুলোতে প্রায় ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
রেনু পোনা পরিবহন ও বিপণনও এ অঞ্চলের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ১০ হাজার পরিবার পাতিলে করে রেনু পোনা পরিবহন ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। তারা দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, ময়মনসিংহ, যশোর, টাঙ্গাইল, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেনু পোনা সরবরাহ করছেন।
মৎস্য উদ্যোক্তা বেলাল হোসেন সরদার বলেন, সরকারের পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আদমদীঘির মৎস্য খাত আরও এগিয়ে যাবে। আধুনিক হিমাগার, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমন্বিত মৎস্য শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হলে এখানকার উৎপাদিত মাছ আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
স্থানীয় উদ্যোক্তা বিশ্বজিৎ সরকার লিটন বলেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, সহজ ঋণ, সংরক্ষণ ও বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আদমদীঘি দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আদমদীঘি সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাহিদ হোসেন বলেন, “আদমদীঘি দেশের মৎস্য খাতের অন্যতম সম্ভাবনাময় এলাকা। পরিকল্পিতভাবে একটি মৎস্য শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা গেলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের মৎস্য উৎপাদনে আদমদীঘির অবদান আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।”