
রিপন দাস, বগুড়া: আমন মৌসুমে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে রাসায়নিক সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে সার পাওয়া গেলেও ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ও ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটসহ (ড্যাপ) বিভিন্ন ধরনের সার কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। কোথাও কোথাও খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি সারে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে নন্দীগ্রাম উপজেলার ওমরপুর ও হাটকড়ই বাজারে কয়েকটি সার বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় চার ব্যবসায়ীকে মোট ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জরিমানাপ্রাপ্তদের মধ্যে মেসার্স অংকন ট্রেডার্সের নিরল কুমারকে ১০ হাজার টাকা, ওমরপুরের মেসার্স স্বপন ট্রেডার্সের স্বপন কুমার মহন্তকে ১৫ হাজার টাকা, মেসার্স মোহসিনা ট্রেডার্সের ইব্রাহিম আলীকে ১৫ হাজার টাকা এবং মেসার্স আলহাজ্ব ট্রেডার্সের বেলাল হোসেনকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, বগুড়ায় সারের কোনো সংকট নেই। চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও সরবরাহ রয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত মৌসুমের তুলনায় চলতি আমন মৌসুমে সারভেদে ১৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরও জানায়, আগস্ট মাসে বগুড়ায় ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৬৯৮ মেট্রিক টন। এর পুরো বরাদ্দই পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৯ হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন এবং অবশিষ্ট সার মজুদ রয়েছে।
এ ছাড়া আগস্ট মাসে টিএসপির চাহিদা ছিল ২ হাজার ৩০৪ মেট্রিক টন, যার পুরোটাই পাওয়া গেছে এবং বিতরণ প্রায় শেষ। এমওপির চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ৩ হাজার ৬১১ মেট্রিক টন ড্যাপের চাহিদার বিপরীতে পুরো বরাদ্দই পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। আর এসব সার সরকারী নির্ধারিত দাম ধরা হয়েছে, ৫০ কেজির বস্তা ইউরিয়া এক হাজার ৩৫০ টাকা, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) এর মূল্য একই আর মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সমপরিমান সার এক হাজার টাকা এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটসহ (ড্যাপ) এর দাম এক হাজার ৫০ টাকা।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মোঃ শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, “আগস্ট মাসের চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ড্যাপ পাওয়া গেছে। বগুড়ায় চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ ফরিদুর রহমান জানান, বগুড়ায় এবার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এলাকাভেদে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ২১৫ থেকে ২৩০ কেজি পর্যন্ত রাসায়নিক সার প্রয়োজন হয়। চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ ভিন্ন। আদমদীঘি উপজেলার সদর ইউনিয়নের চড়কতলা এলাকার কৃষক লকেশ্বর চন্দ্র সরকার বলেন, ৫০ কেজি ইউরিয়া সারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও বাজারে তা ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ইউরিয়ার পাশাপাশি টিএসপি, এমওপি ও ড্যাপসহ অন্যান্য সারও বস্তাপ্রতি গড়ে ৫০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের কৃষক আইয়ুব আলী বলেন, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি সারে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। এতে আমন চাষের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
নন্দীগ্রাম উপজেলা সদরের কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, বাজারে পর্যাপ্ত সার থাকলেও কিছু ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।
কৃষকদের দাবি, কৃষি বিভাগের বরাদ্দ ও সরবরাহ যদি পর্যাপ্ত থাকে, তাহলে নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সুযোগ থাকার কথা নয়। তাই বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়িয়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বগুড়ায় সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কৃষকদের কাছে যাতে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছায়, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে।



