
নিজস্ব প্রতিবেদক: বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজন ও কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের পর ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষের পর নিরাপত্তার দাবিতে মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন শজিমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিনিয়র ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকদের দায়িত্বে রেখে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের আব্দুল মালেক (৫০) অ্যাজমাজনিত সমস্যা নিয়ে মঙ্গলবার শজিমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে হাসপাতালের বেডেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর রোগীর স্বজনেরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের দেওয়া ভুল ইনজেকশনের কারণেই আব্দুল মালেকের মৃত্যু হয়েছে।
এ নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রথমে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে বহিরাগত ব্যক্তিরাও হাসপাতালে প্রবেশ করে তাঁদের ওপর হামলা চালান। এতে অন্তত ছয়জন ইন্টার্ন ও মিড-লেভেলের চিকিৎসক আহত হন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের হাতের হাড় ভেঙেছে বলে দাবি চিকিৎসকদের।
প্রথম দফা সংঘর্ষের খবর পেয়ে হাসপাতালের ইন্টার্ন হোস্টেলে থাকা অন্য চিকিৎসকেরা ঘটনাস্থলে আসেন। পরে মেডিসিন ওয়ার্ডের সপ্তম তলায় দ্বিতীয় দফায় দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এতে রোগীর ছয় স্বজন আহত হন।
অন্যদিকে স্বজনদের অভিযোগ, সংঘর্ষের একপর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাঁদের সঙ্গে থাকা কয়েকজনকে মারধর করে হাসপাতালের ভেতরে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালে যায় পুলিশ। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, পুলিশ পৌঁছালে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাঁদের জানান, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে বহিরাগতরা তাঁদের ওপর হামলা করেছেন।
একই সময়ে রোগীর ছয় স্বজনকে হাসপাতালে আটকে রাখার বিষয়টিও পুলিশ জানতে পারে। হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় দুই ঘণ্টা পর পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। পরে আহতদের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, ছয়জনের মধ্যে চারজন অসুস্থ থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অপর দুজনকে থানায় নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে উভয় পক্ষকে নিয়ে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাত ১টার দিকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আহত রোগীর স্বজনদের চিকিৎসা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপপরিচালক মঞ্জুর-ই মোরশেদ বলেন, একজন অ্যাজমা রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কিছুসংখ্যক বহিরাগত হাসপাতালে ঢুকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধর করেন। এতে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। হাসপাতাল প্রশাসন ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সিনিয়র ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকদের দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনায় বগুড়া সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে মামলা হলে আটক ছয়জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, বগুড়া শহরের নিশিন্দারা এলাকার মোঃ তানরিন (২৬), ফুলবাড়ীর মোঃ রাকিবুল হাসান (১৯), মোঃ প্রান্ত (২২), এম এম মিনহাজ (১৮), মোঃ নাফিউল (২৬) এবং ফুলবাড়ী দক্ষিণপাড়ার মোঃ বিপ্লব হোসেন (২৬)।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লিখিত অভিযোগ করেছে। তবে ঘটনার বিষয়ে রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
সংঘর্ষের পর হাসপাতাল এলাকায় কিছু সময় উত্তেজনা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন ও পুলিশ।



