অর্থ ও বানিজ্য
প্রধান খবর

ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ৫ বছরের রোডম্যাপ, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ১৩ দফা

দেশের সংকটগ্রস্ত ব্যাংকিং খাত সংস্কারে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে গতকাল উপস্থাপন করা ১৩ দফার এই সংস্কার পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে একক গ্রাহকের ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, বিপুল প্রভিশন ঘাটতি, পুঞ্জীভূত লোকসান এবং দুর্বল ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার কৌশলও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ

যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে পর্যালোচনামূলক বৈঠক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব বৈঠকে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে তদারকি করা হবে।

এ ছাড়া উচ্চ খেলাপি ঋণগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ আদায় কৌশলসংক্রান্ত গাইডলাইন জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকাও হালনাগাদ করা হবে।

আগামী এক বছরের মধ্যে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা

আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (আইএফআরএস)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি’ বা এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস ভিত্তিক খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

আইনি জটিলতা ও আইনি প্রভাব পর্যালোচনা সাপেক্ষে সাধারণ ঋণখেলাপি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের পরিকল্পনাও করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের আরও মনোযোগী ও উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা দেওয়ার নীতিমালা করা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করে প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন ও হালনাগাদ করা হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ

একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, তার একটি সীমা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নেওয়া কিছু ব্যবস্থা সাধারণ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায় কি না, তা বিবেচনা করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। খেলাপি ঋণগ্রহীতারা যাতে রিটের মাধ্যমে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারেন, সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে প্রয়োজনে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারি খাতে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তাও দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইতোমধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি বা রিস্ক-বেজড সুপারভিশন ব্যবস্থা চালু করেছে। এ ব্যবস্থার আওতায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থার মূল্যায়ন করে একটি সামগ্রিক কম্পোজিট রিস্ক রেটিং করা হবে। সেই রেটিং অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬’, অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধন এবং ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন প্রতিস্থাপন করে ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপসি আইন’ প্রণয়নের কাজ চলছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের কাজও এগিয়ে চলছে।

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি বিতরণ করা মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার কথা ছিল। তবে ব্যাংকগুলো সংস্থান করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।

গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে নিট লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। রিটার্ন অন অ্যাসেটস (আরওএ) ও রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চে তা আরও কমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। এটি ব্যাসেল-৩ মানদণ্ডের সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক নিচে।

দেশের মাত্র ৪০টি ব্যাংক সর্বনিম্ন মূলধন শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে ১৫টি ব্যাংক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ৭৭ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মূলধনের এই দুর্বলতা ব্যাংকগুলোর লোকসান শোষণক্ষমতা, আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন ঋণ সম্প্রসারণের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক বা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধনের নিচে রয়েছে, সেসব ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন ও পুনঃমূলধনীকরণ প্রয়োজন।

২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি

সংসদীয় কমিটিতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।

বিপুল খেলাপি ঋণ, তার বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদমানের কারণে এই লোকসান হচ্ছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এসব কারণে ব্যাংকগুলোর পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ক্রেডিট লস সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক নিট লোকসানে পড়ছে।

লোকসানি ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানও লোকসানে চলছে।

১২ ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংকটে থাকা ১২টি ব্যাংককে মোট ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এ ছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা, এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছে।

সর্বশেষ ঋণদাতা বা ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে এই সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকগুলো এই ঋণের মূল অর্থ পরিশোধ করছে না, শুধু সুদ পরিশোধ করছে। তারল্য সহায়তার মূল অর্থ ডিমান্ড লোন হিসেবে রোলওভার বা নবায়ন করা হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে তারল্য ঘাটতি নেই

নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংক সংকটে থাকলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার সম্পদ রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে ৭ লাখ ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এতে প্রমাণ হয় যে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই।

সংসদীয় কমিটি আর্থিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: টিবিএস

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button