ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দ, শঙ্কায় বৈশ্বিক বাণিজ্য

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দুটি বড় বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ জব্দ করে উপকূলে নিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেলসহ দুটি ট্যাংকার হেফাজতে নেওয়ার দাবি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা একে ‘জাহাজ যুদ্ধের’ নতুন পর্যায় হিসেবে দেখছেন।
ইরানের জব্দ করা দুই জাহাজ
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ওমান সাগর থেকে এমএসসি ফ্রান্সেসকা এবং এপামিনন্ডাস নামের দুটি জাহাজ জব্দ করেছে।
লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ও গ্রিক মালিকানাধীন এই জাহাজটিতে ২১ জন ক্রু সদস্য রয়েছেন। গ্রিক কোস্টগার্ডের তথ্যমতে, ক্রুদের মধ্যে ইউক্রেনীয় ও ফিলিপিনো নাগরিক রয়েছেন। জাহাজটি ভারতের একটি বন্দরের উদ্দেশে যাচ্ছিল।
পানামার পতাকাবাহী এই জাহাজটির মালিক বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)।
এর ক্যাপ্টেনসহ তিন নাবিক মন্টেনেগ্রোর এবং অন্তত দুজন ক্রু ক্রোয়েশিয়ার নাগরিক। তবে এমএসসি কর্তৃপক্ষ বাকি ক্রুদের পরিচয় প্রকাশ করেনি।
গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া ও মন্টেনেগ্রো সরকার জানিয়েছে, ক্রুরা এখন পর্যন্ত নিরাপদ আছেন। তবে তেহরান ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের মধ্যে মুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ
ইরানের এই পদক্ষেপের পর ওয়াশিংটন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনিন পিরো জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দিনে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে, যেগুলোতে ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল রয়েছে।
ওয়াশিংটনের নতুন সিদ্ধান্ত
সমুদ্রে আটকে থাকা ইরানি তেল বিক্রির জন্য দেওয়া বিশেষ স্বল্পমেয়াদি ছাড় আর নবায়ন করবে না মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই এই তেলের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, যেসব দেশ বা কোম্পানি ইরান থেকে তেল কিনবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গ্রেট প্রেশার’ কৌশলের অংশ।
জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা ও অতীতের নজির অনুযায়ী, জব্দ করা এই তেল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনের মতো কোনো বন্দরে খালাস হতে পারে। গত ডিসেম্বরে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ দ্য স্কিপার টেক্সাসে নিয়ে গিয়ে এর জ্বালানি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাবের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চলে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
এর ফলে-
- বাণিজ্যিক জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে
- বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়বে
- দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত, এবং ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে
মধ্যপ্রাচ্যের এই সামুদ্রিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা



