
ইসলামে শুক্রবার বা জুমার দিন দিনসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। মহানবী (সা.) বলেছেন, দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। এই দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, তাকে পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে এই দিনেই। তার মৃত্যুও হয়েছে এই দিনে এবং তার তাওবাও কবুল হয়েছে এই দিনে। কেয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিনেই। মানুষ ও জিন ছাড়া এমন কোনো প্রাণী নেই, যা কেয়ামত কায়েম হওয়ার ভয়ে জুমার দিন ভোর থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত চিৎকার করতে থাকে না।
রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআলা তা অবশ্যই দান করেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৬, সুনানে নাসাঈ: ১৪৩০)
আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহ এই দিনটিকে মুসলমানদের জন্য ঈদের দিনরূপে নির্ধারণ করেছেন। তাই যে ব্যক্তি জুমার নামাজ আদায় করতে আসবে সে যেন গোসল করে, সুগন্ধি থাকলে তা ব্যবহার করে এবং মিসওয়াক করে। (সুনানে ইবনে মাজা: ৮৩)
আরও একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জন করে, তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর মসজিদে যায় এবং কাউকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা না করে নির্ধারিত নামাজ আদায় করে, এরপর ইমাম খুতবা শুরু করলে মনোযোগ দিয়ে শুনে-তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি: ৯১০)
এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, শুক্রবার আল্লাহর স্মরণ, দোয়া, নামাজ ও নেক আমলের জন্য একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন। কোরআন-হাদিসে শুক্রবারের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা উল্লেখ রয়েছে। নিচে শুক্রবারের বিশেষ ১০টি আমল তুলে ধরা হলো-
১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা
জুমার নামাজের আগে ভালোভাবে গোসল করা, নখ ও গোঁফ কাটা, অপ্রয়োজনীয় লোম পরিষ্কার করা, দাঁত ব্রাশ বা মিসওয়াক করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত।
২. দ্রুত মসজিদে যাওয়া
জুমার নামাজের জন্য যত দ্রুত সম্ভব মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, যখন জুমার দিনে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বর্জন কর।” (সুরা জুমা: ৯)
হাদিসে এসেছে, জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা আগত মুসল্লিদের নাম লিপিবদ্ধ করেন। যে আগে আসে সে যেন একটি উট কোরবানি করার সওয়াব পায়, এরপরের জন গরু কোরবানির সওয়াব পায়—এভাবে ক্রমানুসারে সওয়াব কমতে থাকে। (সহিহ বুখারি: ৯২৯)
৩. মসজিদের আদব রক্ষা করা
মসজিদে গিয়ে সামনে বসার চেষ্টা করা ভালো, তবে অন্যদের কষ্ট দিয়ে কাতার ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া ঠিক নয়। রাসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, “বসে পড়, তুমি দেরি করে এসেছ এবং মানুষকে কষ্ট দিচ্ছ।” (সুনানে আবু দাউদ: ১১১৮)
৪. নফল ও সুন্নত নামাজ আদায় করা
মসজিদে আগে পৌঁছালে তাহিয়্যতুল মসজিদ বা দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা উচিত। জুমার আগে চার রাকাত এবং পরে চার রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করার আমল সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত।
৫. মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা
জুমার খুতবা শোনা ওয়াজিব। খুতবার সময় কথা বলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়া নিষেধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, খুতবার সময় কাউকে ‘চুপ কর’ বলাও অনর্থক কথা। (সহিহ বুখারি: ৯৩৪)
৬. যথাযথভাবে জুমার নামাজ আদায় করা
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুমার নামাজ। মনোযোগ ও একাগ্রতার সঙ্গে তা আদায় করা উচিত।
৭. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা
রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ কর। (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৩)
৮. বেশি বেশি দোয়া করা
জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন। (সহিহ বুখারি: ৯৩৫)
অনেক আলেমের মতে, এই বিশেষ সময়টি জুমার খুতবা থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত। আবার অনেকের মতে আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ সময়।
৯. আসরের পর বিশেষভাবে দোয়া করা
হাদিসে এসেছে, জুমার দিনে এমন কিছু সময় আছে যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তা তাকে দেওয়া হয়। তাই বিশেষ করে আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টিতে বেশি বেশি দোয়া করা উত্তম। (সুনানে নাসাঈ: ১৩৯২)
১০. সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা
রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর থাকবে। (সহিহুল জামে: ৬৪৭০)
সুতরাং জুমার দিনটি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এ দিনে বেশি বেশি ইবাদত, দোয়া, দরুদ পাঠ এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।