
নিজস্ব প্রতিবেদক: রোপা আমন ধান চাষাবাদের ভরা মৌসুমে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ডিলারদের একটি সিন্ডিকেট নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার বিক্রি করছে। ফলে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে কৃষক, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার সারের বড় মোকাম নসরতপুর বাজারে সরেজমিনে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা মেলে। সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে বাজারের সাতজন কীটনাশক ও খুচরা সার বিক্রেতা একে একে দোকান বন্ধ করে দেন।
এ সময় নসরতপুর ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মেসার্স শামসুল হক খন্দকারের মালিক সাজেদুল হক রোমেল সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির কথা স্বীকার করেন। তিনি ভবিষ্যতে সহনীয় দামে নন-ইউরিয়া সার বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাংবাদিকদের দ্রুত চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন।
এরই মধ্যে পাশের নিমকুড়ি গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন কৃষক সার না পেয়ে হৈচৈ শুরু করেন। তারা অন্য ইউনিয়নের কৃষক হওয়ায় ডিলার প্রথমে সার দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে কৃষকদের অনুরোধে তাদের এক বস্তা করে নন-ইউরিয়া সার দেওয়া হয়।
তথ্য সংগ্রহের সময় ডিলার সাজেদুল হক রোমেল চায়না ব্র্যান্ডের প্রতি বস্তা ডিএপি সার এক হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রির কথা স্বীকার করেন। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম প্রতি বস্তা এক হাজার ৫০ টাকা। তিনি দাবি করেন, শুধু তিনি নন, অন্য ডিলাররাও বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।
একইভাবে এক হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারিত দামের তিউনিশিয়া ব্র্যান্ডের কালো রঙের টিএসপি সার এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা এবং মরক্কো ব্র্যান্ডের ধূসর-সাদা রঙের টিএসপি সার সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া এক হাজার টাকা দামের কানাডা ব্র্যান্ডের দানাদার এমওপি সার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১৫০ টাকা দরে। তবে রাশিয়া থেকে আমদানি করা ঝুড়া দানার এমওপি সার ডিলার রেটে প্রতি বস্তা ৯০০ টাকা দরে বিক্রির সুযোগ থাকলেও এর কোনো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন ডিলাররা।
ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রেও সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত এক হাজার ৩০০ টাকা বস্তা দামেই ইউরিয়া বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকটের কারণে স্থান, চাহিদা ও ব্র্যান্ডভেদে প্রতি বস্তায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের বরাদ্দ সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্ট মাসে আদমদীঘিতে ১০ জন বিসিআইসি ডিলারের অনুকূলে ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ জন বিসিআইসি ও ১৯ জন বিএডিসি ডিলারের অনুকূলে ৩৯০ মেট্রিক টন ডিএপি, ২৭০ মেট্রিক টন এমওপি এবং ১৪০ মেট্রিক টন টিএসপি সার বরাদ্দ রয়েছে।
এত বিপুল পরিমাণ সার বরাদ্দের পরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং বাড়তি দামে নন-ইউরিয়া সার বিক্রির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সাব-ডিলার, কৃষক ও খুচরা সার বিক্রেতারা জানান, তারা ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। আবার সার পেলেও নন-ইউরিয়া সার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, সার কেনার সময় ডিলাররা প্রতিষ্ঠানের নামে ছাপানো রশিদের পরিবর্তে সাদা কাগজের স্লিপ দেন। এর প্রতিবাদ করলে পরবর্তীতে তাদের কাছে সার বিক্রি করা হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়। এ কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
তবে সারের কৃত্রিম সংকট ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদমদীঘি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, “কোনো সারই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই।”
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্যের বিষয়ে সাব-ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও কৃষকরা দাবি করেন, ডিলাররা তাদের রশিদ না দিলেও মাসিক প্রতিবেদন দেওয়ার সময় কৃষক, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের নামে সরকার নির্ধারিত দাম উল্লেখ করে কাটা রশিদের কার্বন কপি জমা দেওয়া হয়।
তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ডিলারদের ক্রয়-বিক্রয় খাতা পরীক্ষা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগকারী সাব-ডিলার, খুচরা সার বিক্রেতা ও কৃষকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।


