
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে ফল বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে দাখিল পরীক্ষায় শূন্য পাস করা ২২৬টি মাদরাসার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এ নোটিশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। শিক্ষা বোর্ডগুলো প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ডেকে ফল বিপর্যয়ের কারণ জানার উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে এমপিও সুবিধা বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চলতি বছর ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫৭টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪৮টি। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে। এবার দাখিল পরীক্ষায় ২২৬টি মাদরাসার কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৮৬টি।
এ ছাড়া গত বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে শূন্য পাস কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। এবার এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে।
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই এমপিওভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ জনের কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। আবার শতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন পরীক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, সরকারি অনুদান পাওয়ার আশায় অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই এবং নিয়মিত পাঠদানও হয় না। কোথাও কোথাও অন্য প্রতিষ্ঠানের অকৃতকার্য বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে এনে পরীক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধনের অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষকদের পাঠদানে অনাগ্রহের কারণেও ফলাফল খারাপ হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
দাখিলে শূন্য পাস ২২৬ মাদরাসাকে নোটিশ
২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা ২২৬টি মাদরাসার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড।
নোটিশে এসব মাদরাসাপ্রধানকে লিখিত বক্তব্যসহ বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদের দপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
অঞ্চলভেদে উপস্থিতির সময়সূচিও নির্ধারণ করেছে বোর্ড। ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের মাদরাসাপ্রধানদের ১৬ আগস্ট, রাজশাহী অঞ্চলের ১৭ আগস্ট এবং রংপুর অঞ্চলের ১৮ আগস্ট উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের মাদরাসাপ্রধানদের ১৯ আগস্ট, খুলনা ও কুমিল্লা অঞ্চলের ২০ আগস্ট এবং বরিশাল অঞ্চলের প্রধানদের ২৩ আগস্ট লিখিত বক্তব্যসহ উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে শূন্য পাস করা ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টিই দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াস আহমেদ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা খুবই কম। কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে তিন-চারজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে শিগগিরই তাদের ডেকে কারণ জানতে চাওয়া হবে। পরে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারিগরি বোর্ডের ব্যাখ্যা
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বলেন, করোনাকালে অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত পড়াশোনা ছাড়াই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছে। পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও প্রায় দুই বছর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছে। ২০২৫ সালের বইও শিক্ষার্থীরা এপ্রিলে পেয়েছে।
এসব সংকটের মধ্যেও এবারের ফলাফলকে তিনি ভালো বলে উল্লেখ করেন। তবে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, এত বেশি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান কেন হয়েছে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ডেকে এর কারণ জানতে চাওয়া হবে।
তাঁর ব্যক্তিগত মত হলো, পরীক্ষা ও মূল্যায়নে কড়াকড়ির কারণে এবার অনেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার শূন্য পাসের ঘটনা ঘটেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ



