
বিএনপির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে নেতৃত্বের পালাবদলের মধ্য দিয়ে। দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তৃতীয় প্রজন্মের নেতা তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এখন দলটির পূর্ণ রাজনৈতিক ভার তাঁর কাঁধেই।
বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির সময়ে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার ভিত্তিতে দলটি গড়ে তোলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁর নিহত হওয়ার পর দলটি পড়ে যায় গভীর নেতৃত্ব সংকটে।
সংকটে নেতৃত্বে খালেদা জিয়া
স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে চরম সংকটের সময়ে বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি দ্রুত দল পুনর্গঠন করেন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফেরান এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন, সংসদীয় রাজনীতি ও একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া—সবকিছুতেই তার নেতৃত্ব ছিল নির্ধারক।
চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়াই ছিলেন বিএনপির অভিভাবক, ঐক্যের প্রতীক ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
তারেক রহমানের সামনে নতুন বাস্তবতা
গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়া এবং পরিবর্তিত রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় তারেক রহমান এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন।
তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দলীয় কোন্দল নিয়ন্ত্রণ, তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করা, বিদ্রোহী প্রার্থী ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সামাল দেওয়া—সবই তার নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই করবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন,
“তারেক রহমানকে দল নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, খাই-খাই প্রবণতা দমন করতে হবে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্য গড়তে হবে—যেমনটি করেছিলেন তার বাবা জিয়াউর রহমান।”
সুশাসন ও নির্বাচনই মূল চ্যালেঞ্জ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর মতে,
“ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে হাইলি কন্টেস্টেড। আওয়ামী লীগ না থাকলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিএনপির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। বিএনপিকে সুশাসন ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করেই এগোতে হবে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফরিদুল আলম মনে করেন,
“তারেক রহমানকে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।”
উগ্রবাদ ও আস্থার প্রশ্ন
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন,
“তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উগ্রবাদ রোধ করা। জনগণের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে দেশ বড় সংকটে পড়তে পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে,
“জাতীয় ঐক্যকে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং প্রশাসনিক ও পেশাজীবী গোষ্ঠীর অপব্যবহার ঠেকানো তারেক রহমানের বড় দায়িত্ব।”
নেতৃত্ব প্রমাণের সময়
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন,
“খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমার জায়গায় এখন শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তারেক রহমানকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে।”
তবে বিএনপির শীর্ষ নেতারা তার নেতৃত্ব নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,
“তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর।”
একটি যুগের শুরু
জিয়াউর রহমানের আদর্শিক ভিত্তি, খালেদা জিয়ার সংগঠকসত্তা এবং তারেক রহমানের কৌশলগত নেতৃত্ব—এই তিন পর্বেই বিএনপির ইতিহাস গঠিত। এখন দলটি দাঁড়িয়ে আছে তৃতীয় পর্বের সূচনায়।
এই পর্ব কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তারেক রহমানের নেতৃত্ব দক্ষতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের সক্ষমতার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তারেক রহমানের যুগ।



