
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সংশোধনী এনে পাঁচ স্তরের নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। তবে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের আচরণবিধি ইসির অনুমোদন হয়েছে। এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং হলে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ-এই পাঁচ স্তরের নির্বাচনের জন্য পৃথক আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, গত জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইন পাস হওয়ার পর আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নেয় ইসি। পরে খসড়া প্রকাশ করে মতামত নেওয়া হয়। সব মতামত পর্যালোচনা করে এবার চূড়ান্ত খসড়া করা হয়েছে। ২০১৬ সালের আচরণবিধির পরিবর্তে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন করা হচ্ছে।
ইসি সচিব জানান, প্রকাশিত খসড়ার সঙ্গে চূড়ান্ত খসড়ার বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে কিছু ক্ষেত্রে শব্দগত পরিমার্জন ও সংযোজন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে পোস্টার বাদ দিয়ে প্রচারণার অন্যান্য বিষয় রাখা হয়েছে।
নতুন আচরণবিধিতে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার জন্য ব্যয় করা অর্থও প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে দেখাতে হবে।
নতুন নির্দেশনা
ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার হবে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট। লিফলেট ও হ্যান্ডবিল হতে হবে এ৪ সাইজের, অর্থাৎ ৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চি। ফেস্টুনের সর্বোচ্চ আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রচারসামগ্রী সাদাকালো রঙে করতে হবে। প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা কোনোভাবেই ৬ ফুটের বেশি হতে পারবে না।
প্রচারসামগ্রীতে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু রাখা যাবে না। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে মুদ্রণের তারিখ না থাকা, পলিথিনের আবরণ এবং পিভিসি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারণায় জীবন্ত প্রাণীও ব্যবহার করা যাবে না।
আগের আচরণবিধিতে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। এবার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। পৌরসভায়ও প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় নির্ধারিত সীমায় বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। পুরো উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
নতুন আচরণবিধিতে মাইক ও শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময়ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বেলা ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো যাবে। একসঙ্গে একটির বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না।
একই সময়ে ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহার করেও প্রচারণা চালানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইকের ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে। এর আওতায় মেয়র, চেয়ারম্যান, প্রশাসকসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ দায়িত্বে থাকা মেয়র, চেয়ারম্যান, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকার পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন আচরণবিধিতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ক্যাম্প, প্রতি ইউনিয়নে একটি ক্যাম্প এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি ক্যাম্প রাখা যাবে।
পৌরসভা নির্বাচনে আগের মতোই নির্ধারিত সীমায় নির্বাচনী ক্যাম্প করার সুযোগ থাকবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনেও প্রচারণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা রাখা হয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনার কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সার্কিট হাউস, রেস্ট হাউস ও ডাকবাংলো ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও পাঁচটি আচরণবিধিতে যুক্ত করা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে নতুন আচরণবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এসব বিধান কার্যকর হবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা

